বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পাল বংশের শাসনামলে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্ম, ব্রাহ্মণ্যবাদী সেন বংশের শাসনামলে বাহ্মণ্য বা হিন্দু ধর্ম, মুসলিম শাসনামলে ইসলাম ধর্ম এবং খ্রিষ্ট ধর্মাবল্বীদের দ্বারা ব্রিটিশ শাসনামলে খ্রিষ্টান ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটে।
১৩ শতাব্দির শুরুর দিকে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজীর নদীয়া বিজয়ের পর তৎকালিন বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আউলিয়া দরবেশগণের আগমন ঘটে এবং ব্যাপকভাবে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটে।
পঞ্চদশ শতকে দক্ষিণবঙ্গ বিজয়ী হযরত খানজাহান আলী (র.) এবং তাঁর সঙ্গে আগত তিনশ ষাটজন দরবেশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যগণ এ অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসতি করেন এবং তাদের অনেকেই পরবর্তিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ইসলাম প্রচারে বের হয়ে পড়েন।
আউলিয়া দরবেশগণের অপূর্ব চারিত্রিক মাধুর্য, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং সাধারণ মানুষের প্রতি তাদের উদার ব্যবহার দেখে এদেশের অমুসলমানগণ ছুটে এসেছেন তাদের কাছে।
দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত কুষ্টিয়া জেলাতেও পীর, আউলিয়া, দরবেশদের মাজার ও দরগাহ স্থাপিত হয়েছে। এসব পীর, আউলিয়া, দরবেশগণের সম্পর্কে তাদের জীবিতকালে যেমন অনেক কিংবদন্তির জন্ম হয়েছিল, তেমনি তাঁদের মৃত্যুর পর তাদের ও তাঁদের মাজার বা দরগাহ্ সম্পর্কে অধিক কিংবদন্তির সৃষ্টি হয়।
কুষ্টিয়া জেলায় আগত পীর-আউলিয়া দরবেশ ও তাদের মাজারঃ
হযরত খোরশেদ-উল-মুলক(র.)
শাহ্ মখদুম মৌলুক খোরশেদ বা দরবেশ মৌলুক খোরশেদ বা খোরশেদ পীর। কাদেরিয়া তরিকাপন্থী কামালিয়াত প্রাপ্ত দরবেশ। তিনি পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইরান হতে এদেশে আসেন। হযরত খানজাহান আলী (র.) তাঁকে ইসলাম প্রচারের জন্য কুষ্টিয়া অঞ্চলে প্রেরণ করেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ির পূর্বদিকে শিলাইদহ গ্রামে তিনি অবস্থান গ্রহণ করেন ও ইসলাম প্রচারে আত্ননিয়োগ করেন।
শোনা যায়, একদিন হযরত খোরশেদ-উল-মুলক (র) একটি জায়নামায ও বিশেষ লাঠি নিয়ে শিলাইদহের পাশে পদ্মা পারের জন্য নৌকায় উঠেন। মাঝ নদীতে মাঝি পারের ভাড়া চাইলে তিনি বলেন আমার কাছে টাকা পয়সা নাই। মাঝি বলেন, ‘টাকা নাই তো নৌকায় উঠেছেন কেন, নেমে গেলেই ভালো হয়’। একথা শুনে তিনি তৎক্ষণাৎ হাতের লাঠি নদীতে নিক্ষেপ করেন। তাঁর কেরামতিতে পদ্মার পানি শুকিয়ে চর পড়ে যায়। তিনি নৌকা থেকে চরে নেমে জায়নামাজ বিছিয়ে নামায পড়তে শুরু করেন এবং ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়েন
সেখানেই তার দরগাহ্ প্রতিষ্ঠিত হয়। তার নাম অনুসারে মৌজাটি খোরশেদপুর হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। তাঁর অলৌকিকতার কথা চতুর্দিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং পাশ্ববর্তী অঞ্চলসমূহ হতে অমুসলিমরাও দলে দলে তাঁর নিকট এসে ইসলাম গ্রহণ করে।
খোশেদ পীরের মৃত্যুর পর তাকে এখানেই সমাহিত করা হয়। শিলাইদহ ইউনিয়ন পরিষদের অদূরে ছাঁয়া সুনিবিড় গ্রামীন পরিবেশে তার কবর ঘিরে মাজার রয়েছে। দীর্ঘদিন তাঁর কবর মটগাছের নিচে ফাঁকা ও কাঁচা অবস্থায় ছিল। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহে জমিদার হয়ে আসার পর মাজারটি পাকা করার নির্দেশ দেন। ১৯০৮ সালে জমিদারী করচে মাজারটি পাকা করা হয়। রবীন্দ্রনাথ মাজারের জমিটি মাজারের নামে ওয়াক্ফ করে দেন।
পরবর্তীতে কবির ভ্রাতুষ্পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২০ সালে মাজার বেষ্টনী নির্মাণ করে দেন। ১৯৯৯ সালে দানবীর আলাউদ্দিন আহমেদ এর অর্থায়নে মাজারটি পূণঃনির্মাণ করা হয়।
পূর্বে মাজারে খাদেম ছিল, তবে এখন নাই। আগে অসংখ্য মানুষ মানত ও সদকার শিরনি দিতে এখানে আসতেন। এখনও অনেকে এখান আসন পীরের মাজার দেখতে ও জিয়ারত করতে।
বর্তমানে মাজারটি কেন্দ্রকরে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে মাজারটি অযন্ত অবহেলায় অপরিস্কার নোংরা পড়ে আছে। মাজারের নাম ফলকটিও হারিয়ে গেছে।
কুষ্টিয়া জেলায় আগত পীর-আউলিয়া দরবেশ ও তাদের মাজার
হযরত লাল পীর (র.)
জনশ্রুতি আছে দিল্লীর সুলতান জুনা খাব বা মুহাম্মদ বিন তুগলক-এর নির্দেশে সুফি দরবেশ হযরত বাবা লাল পীর (র.) উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিয়ে কুষ্টিয়া অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে আসেন এবং কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলার অন্তর্গত জুনিয়াদহ গ্রামে আস্তানা করেন।
হযরত লাল পীর (র.) জুনিয়াদহ গ্রামে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদের সামনে একটি বিশালাকার কদম গাছের তলে লাল পীরের মাজার গড়ে উঠে। যদিও কদম গাছটি এখন আর নাই। পীরের নির্মীত মসজিদটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে মুনসেফ মুন্সী এবাদতুল্লা সে স্থানে বর্তমানে অবস্থিত প্রাচীণ মসজিদটি উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পূণ নির্মাণ করেন।
জনশ্রুতি আছে, হযরত লাল পীর (র.) প্রতি শ্রুক্রবার জুম্মার নামাজের পর লাল মোরগের গোশত খেতেন। সেই কারণে তাঁকে লাল পীর আখ্যায়িত করা হয়। এখনও অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে লাল পীরের মাজারে লাল মোরগ মানত করতে আসেন।
বর্তমানে মাজারটিতে কোন খাদেম নাই। মসজিদের খাদেমই মাজটির দেখভাল করে থাকেন।
কুষ্টিয়া জেলায় আগত পীর-আউলিয়া দরবেশ ও তাদের মাজার
হযরত মহিউদ্দীন বদায়ুনী (র.) ওরফে ঘোড়ে শা্হ
কুষ্টিয়া জেলায় যে সকল আউলিয়া ব্যপকভাবে ইসলাম প্রচার করেন তাদের মধ্যে হযরত মহিউদ্দীন বদায়ুনী (র.) ওরফে ঘোড়ে শাহ অন্যতম।
হযরত মহিউদ্দীন বদায়ুনী (র.) পঞ্চাশ শতকের শেষদিকে ভারতের বদায়ুন থেকে ইসলাম প্রচারের জন্য কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় আগমণ করেন। তিনি ভেড়ামারার বিত্তিপাড়ায় আস্তানা স্থাপন করেন এবং ভেড়ামারা, মিরপুর এবং দৌলতপুর অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করেন।
হযরত মহিউদ্দীন বদায়ুনী (র.) ঘোড়ায় সওয়ার করতেন এবং ঘোড়ায় চড়েই নানা স্থানে যাতায়াত করতেন বলে লোকে তাঁকে ঘোড়ে শাহ বলতেন। তিনি ছিলেন চিশতীয়া তরীকাপন্থী সাধক।
তিনি সামা ও কাওয়ালী গাইতেন বলে জনশ্রুতি আছে। যার দরুন এই অঞ্চলে পরবর্তিতে বাউল প্রভাব বৃদ্ধি পায়। ভেড়ামারা শহরের পশ্চিমপ্রান্তে মৃতপ্রায় হিসনা নদীর ধারে বটগাছের নিচে ঘোড়ে শাহ পীরের মাজার অবস্থিত। মাজার চত্বরটি বড় প্রবেশদ্বারসহ সীমানা প্রাচীর দ্বারা সংরক্ষিত।
১৯৩৮ সালে স্থানীয়রা মাজারটি মেরামত করেন। পরবর্তীতে মাজারে যাওয়ার রাস্তার মুখে বড় তোরণ নির্মীত হয়েছে। নদীর পাড় বাঁধাই করে ভক্তদের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাজার সংলগ্ন বড় জামে মসজিদ আছে। মাজার প্রাঙ্গনে ঈদের বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতি বছর বৈশাখ মাস জুড়ে মাজার প্রাঙ্গনে বৈশাখী মেলা বসে। দূর-দূরান্ত থেকে বহু ভক্ত ও বাউল ফকির বৈশাখে এখানে জড় হন। সারারাত বাউলগান, মারফতি, ভাওয়াইয়া ও কাওয়ালী গান চলে। জৈষ্ঠ্যের প্রথম প্রহরে জলসা ও মিলাদ মহফিল সম্পন্ন করে তবারক-শিরনি বিতরণ করা হয়।
কুষ্টিয়া জেলায় আগত পীর-আউলিয়া দরবেশ ও তাদের মাজার
হযরত পীর বুড়ো দেওয়ান (র.)
হযরত পীর বুড়ো দেওয়ান (র.) মুঘল বাদশাহ মির্জা জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর-এর শাসনামলে ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীর কালোয়া গ্রামে আসেন। তিনি ওজুদিয়াতে বিশ্বাসী ছিলেন এবং অধিকাংশ সময় আল্লাহর ধ্যানে মশগুল থাকতেন। তিনি বারো মাস রোযা রাখতেন।
বুড়ো দেওয়ান (র.) আনুমানিক ১৫১৭ সালে সুলতান ইব্রাহিম লোদির শাসনামলে বাগদাদ থেকে ভারতের দিল্লী আসেন। বাদশাহ তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য ‘চৌদ্দ তোলা জহর’ খাইয়ে একটি প্রসাদে তালা বদ্ধ করে রাখেন। প্রাসাদে পাহারাদারও নিযুক্ত করেন। সকালে দেখা গেল তিনি প্রসাদের মধ্যে নাই। ছাঁদে দাঁড়িয়ে তসবিহ হাতে আল্লাহর জিকিরে মশগুল আছেন। জহরের কোন ক্রিয়া তাঁর শরীরে হয়নি। বাদশাহ তাঁর কেরামতি দেখে খেলাত ও নজরানা দিয়ে মাফ চেয়ে নেন।
এরপর তিনি দিল্লী থেকে ঢাকা মিরপুরে হযরত সৈযদ শাহ আলী বাগদাদী (র.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁরা দুইজন বাংলার বিভিন্ন স্থানে ইসলাম প্রচার করেন। সৈয়দ শাহ আলী বাগদাদী (র.) এর সাথে ফরিদপুরের গির্দা-গট্রিয়াতেও ইসলাম প্রচার করেন। বাগদাদী (র.) উপদেশে তিনি এরপর কুষ্টিয়া আসেন।
তিনি প্রথমে কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কসবা মাজগ্রামে খানকা শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন। তার খানকায় ধর্ম উপদেশ শোনার জন্য শত শত মানুষ জড় হতেন। এরপর তিনি মাজগ্রাম হতে কালোয়া গ্রামে এসে আরেকটি খানকা স্থাপন করেন। তিনি তাঁর অমায়িক ব্যবহার ও উন্নত চরিত্র দ্বারা অত্র এলাকার হিন্দু-মুসলমানের হৃদয় জয় করেছিলেন।
পদ্মা নদীর তীব্র ভাঙ্গনে তার কবরটি বিলিন হওয়ার মুখে তাঁর হাড়-কঙ্কাল মাটিসহ তুলে এনে বর্তমান মাজারের স্থানে স্থান্তরিত করা হয়। পরবর্তিতে কেরামত আলী মাস্তান নামক একজন মাজারের পবিত্রতা রক্ষার্থে নিজ অর্থায়নে মাজারটি পাকা করে দেন।
এখনও হযরত পীর বুড়ো দেওয়ানের মাজারে ধর্মসভা, দোয়া খায়ের করা হয়ে থাকে। প্রতিবছর ১৫ ফাল্গুন মাজার প্রাঙ্গনে পবিত্র ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়।
কুষ্টিয়া জেলায় আগত পীর-আউলিয়া দরবেশ ও তাদের মাজার
দরবেশ খাক-ই-দেওয়ান (র.) ও দরবেশ চিকনা-ই-দেওয়ান (র.)
মুঘল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে ১৫ শতকের শেষে অথবা ১৬ শতকের শুরুর দিকে পিঠাপিঠি দুই ভাই ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে কুষ্টিয়ার খোকশা অঞ্চলে আগমন করেন।
আস্তানা নির্মানের জন্য মহিষবাথান গ্রামের জমিদারের কাছে জমি চাইলে জমিদার জঙ্গলাকীর্ণ ও বন্যপ্রাণির আবাসস্থল উত্থলী অঞ্চলে কিছু জমি দেন। সেখানেয় গভীর জঙ্গলের মধ্যে তারা আস্তানা নির্মাণ করে গভীর ধ্যানে মগ্ন হন। কিছুদিন পর জমিদারের পেয়াদারা জঙ্গলে তাদের খোজ নিতে এসে দেখেন দুইভাই বাঘের শরীরে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছেন।
খবর পেয়ে জমিদার এলাকার জঙ্গল পরিস্কার করে তাদের বাসযোগ্য করে দেন এবং ঐ এলাকার জমির দেখাশোনা করার জন্য ছোটভাইকে দেওয়ান হিসেবে নিয়োগ দেন। তাদের দুই ভায়ের কাছে বহু অমুসলিম মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
দরবেশ খাক-ই-দেওয়ানের অলৌকিকতার বহু কিংবদন্তি শোনা যায়। যেমন তাঁর হাতের লাঠি ফেলে দিলে বাঘ হয়ে যেতো এবং তিনি বাঘের পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়াতেন। তিনি নাকি তাঁর পেটের নাড়ীভূড়ি বের করে ধৌত করতেন।
প্রাচীর বেষ্টিত মাজার এখনও সেখানেই আছে। তারা এলাকার পানির কষ্ট দূর করার জন্য একটি পুকুর চালু করেছিলেন যা বর্তমানে ভরাট হয়ে গেছে।
কুষ্টিয়া জেলায় আগত পীর-আউলিয়া দরবেশ ও তাদের মাজার
সৈয়দ নুরুল্লাহ
মুঘল শাসনামলে হযরত খানজাহান আলী (র.) এর সঙ্গে বাগদাদ হতে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে যে ৩৬০ জন আউলিয়া আসেন তাঁদের ১২ জন আউলিয়া কুষ্টিয়া অঞ্চলে অবস্থান করেন। সৈয়দ নুরুল্লাহ তাদেরই একজন বলে অনুমান করা হয়।
সৈয়দ নুরুল্লাহ তৎকালীন মোহাম্মদ শাহী পরগনার ১৬ আনার ৬ আনা জমিদারী ক্রয় করে কুমারখালীর সাওতা অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। জনশ্রুতি আছে যশোর বারোবাজার থেকে পীর সাহেবের একজন সুফি বন্ধু দেখা করতে আসছেন শুনে তিনি মাটির দেওয়ালে চড়ে উড়ে গিয়ে পথমধ্যে বন্ধুকে স্বগত জানান।
সৈয়দ নুরুল্লাহর মধ্যে আধ্যাত্নিকতা লুকিয়ে ছিল, যার কারণে বনের পশু-পাখিও নুরুল্লাহকে ভক্তি শ্রদ্ধা করতো। জনশ্রুতি আছে, কুমির নদীর তীরে আসলে পানির ওপরে ভেসে উঠে পীর সাহেবকে সম্মান জানাতো।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীর সাওতা গ্রামে গড়াই নদীর তীরে বাবা সৈয়দ নুরুল্লাহ এর মাজার অবস্থিত। ১৯২২ সালে মাজারটি নদীভাঙ্গনে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ১৯৬২ সালে জিকে প্রকল্পের বাঁধ নির্মানের ফলে মাজারের জমি পূনরায় চরাকারে জেগে উঠে।
কুষ্টিয়া জেলায় আগত পীর-আউলিয়া দরবেশ ও তাদের মাজার
হযরত জিন্দাপীর আল কাদরী আল মাদানী শাহ্ জহিরউদ্দীন (র.)
হযরত আল কাদরী আল মাদানী শাহ্ জহিরউদ্দীন (র.) মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে কুষ্টিয়ার মিরপুরের কুরিপোল গ্রামের জঙ্গলে এসে আস্তানা করেন। তাঁর বংশধরদের মতে তিনি মদিনা থেকে এসেছিলেন এবং বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (র.) এর ইরাকের বাগদানে অবস্থিত মাজারের খাস মুরিদ ও অনুসারী ছিলেন।
উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরে তিনি এই অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের জন্য আস্তানা নির্মাণ করেন। তিনি যখন এ অঞ্চলে আগমন করেন তখন এখানে অমুসলিম কৃষিজীবী ও জেলে সম্প্রদায় বাস করতো। তাঁর অমায়িক ব্যবহার, জনসেবা এবং গভীর উপাসনায় মুগ্ধহয়ে স্থানীয় অধিকাংশ অমুসলিম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
কথিত আছে, হযরত শাহ্ জহিরউদ্দীন (র.) মৃত্যুর পূর্বে কবর কাটার নির্দেন দেন এবং জিকিরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর সাতদিন পর খেয়াঘাটের এক মাঝি তাঁর বাড়ি এসে জানায় যে, পীর সাহেব আগের দিন খেয়া পার হয়ে কোথায় চলে গেছেন। তাঁর পারের পয়সা বাড়ী থেকে নিতে বলায় মাঝি টাকা নিতে এসেছেন।
এই ঘটনার পর তাঁর কবর খুঁড়ে দেখা যায় যে সেখানে তাঁর লাস নাই। সেই থেকে তাঁকে জিন্দাপীর বলে এলাকাবাসী জানেন।
১৮০০ সালে পীরের উত্তরসূরী মরহুমা মোছাম্মৎ করিম-উন-নেছা তাঁর পূর্বসূরি থেকে প্রাপ্ত জমির উপর একটি মসজিদ নির্মাণ করে দেন। জনৈক মাহবুবুর হক খান চৌধুরী নামক একজন হযরত শাহ্ জহিরউদ্দীন (র.) এর মাজার শরীফ পাকা করে দেন।
প্রতি বছর ১১ শাওয়াল পীর সাহেবের ওরশ অনুষ্ঠিত হয়। বড়পীর হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (র.) এর ওফাতের দিন ১১ রবিউস সানি তারিখেও এখানে ওরশ অনুষ্ঠিত হয়।
কুষ্টিয়া জেলায় আগত পীর-আউলিয়া দরবেশ ও তাদের মাজার
বাবা একদিল শাহ্
নবাব আলীবর্দী খা’র শাসনামলে পদ্মা নদীর ভরা যৌবন। প্রবল প্রবাহমান গড়াই নদী। পদ্মার কূল ঘেঁসে গড়ে উঠা হাঠস হরিপুর গ্রামের মানুষ ছিল অনেক ধর্মভীরু। হঠাৎ একদন এই গ্রামের পদ্মার কূলে এসে এক দরবেশ বাবা হাজির হন। মেখে কোন কথা নেই, সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকেন পদ্মার উথাল-পাতাল ঢেউয়ের দিকে।
কাঁধে একটি ঝোলা আর হাতে একটি লাঠি। কেউ কিছু জিজ্ঞাস করলে কোন উত্তর দেন না। যখনই তাঁকে দেখা যায়, তখনই তিনি কি এক ধ্যানমগ্ন থাকতেন। এখাবে কেটে যায় বেশ কছুদিন।
একসময় পদ্মার করাল গ্রাসের সিকার হল পুরাতান কুষ্টিয়া। ভাসিয়ে নিয়ে গেল মানুষ, প্রানীকুল, ফসলাদি ও গাছপালা। বাবা একদিল শাহ প্রখর দৃষ্টি নিবন্ধন করলেন পদ্মার দিকে। হাতের লাঠি দিয়ে আঘাত করতে থাকলেন পদ্মার বুকে। এভাবে কেটে গেল কয়েকদিন। একদিন দেখা গেল পদ্মা শান্ত হয়ে এসেছে।
বাবা একদিল শাহের কেরামিত দেখে সেই সময় গ্রামের মানুষ এসে হাজির হল তাঁর কাছে। তিনি কাউকে কিছু বললেন না। একটি বটগাছের চারা লাগিয়ে দিলেন তার বসার জায়গায়। ক্রমেই তাঁর ভক্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগলো। দিন রাত যখনই তাঁর কাছে কেউ যায় কেউ তাকে কখনো ঘুমাতে বা খাবার খেতে দেখেননি।
এলাবাসির মতে বাবা একদিল শাহ বটগাছের নিচে থাকতেন। সেখানে একটি চালাঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। সেখানেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
প্রতি বছর ২৯ ফাল্গুন এখানে মিলাদ মাহফিল, ৯ ও ১০ চৈত্র ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি শুক্রবার বটতলায় মানতের শিরনি আসে।
কুষ্টিয়া জেলায় আগত পীর-আউলিয়া দরবেশ ও তাদের মাজার
হযরত সোনাবন্ধু (র.)
হযরত সোনাবন্ধু (র.) সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সঠিকভাবে পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয়, সোনাবন্ধু (র.) রাজবাড়ী জেলার মাকরাইল গ্রামে এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। দারিদ্রের কারণে বাল্যকালে তিনি কুমারখালীর বশিরউদ্দিন নামক একজন চাষীর বাড়ীতে গরু চড়ানোর কাজ নেন।
একবার একটি গরু হারিয়ে গেলে গৃহকর্তা গরুটি খোজ করতে বললে তিনি বলেন, ‘গরু বাড়ীতে আসছে’। কিছুক্ষণ পর গরুটি বাড়ী ফিরে এসে গ্রহকর্তা তার অলৌকিকতা গুণ বুঝতে পেরে তাঁকে দিয়ে আর কাজ করাননি।
দরবেশ সোনাবন্ধু তাঁর প্রকৃত পরিচয় কাউকে কখনো বলেননি। কুমারখালীর একজন সাধক সোনাউল্লাহ তাঁকে ‘বন্ধু’ বলতেন। সেই থেকে লোকমুখে তাঁর নাম “সোনাবন্ধু” হয়ে যায়। পরবর্তিতে সোনাবন্ধু একজন বিখ্যাত ইসলাম প্রচারক হিসাবে আত্নপ্রকাশ করেন।
সোনাবন্ধুর মৃত্যুর পর সোনাউল্লাহ তাঁতে নিজ হাতে কবর দিয়েছিলেন। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলা শহরের বাজারের মধ্যে দরবেশ সোনাবন্ধু (র.) মাজার অবস্থিত। মাজারের মূল দরজার উপর খোদায় করে ‘পীরপাল হযরত সোনাবন্ধু (র.) এর মাজার শরীফ’ লেখা রয়েছে।
ইংরেজ আমলে রেলওয়ের একজন অফিসার তাঁর কবরটি পাকা করে দেন। নলডাঙ্গার জমিদার তাঁর মাজার সেবা জন্য বিস্তর জমি দান করেছিলেন। কেরামত মস্তান নামক জনৈক কামেল ব্যক্তি মাজারটি সংস্কার করে দেন এবং কিছুকাল তিনি নিজেই এই মাজারের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করেন।
প্রতি বছর হযরত সোনাবন্ধুর মাজারে ২৭ বৈশাখ ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। বহু দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তবৃন্দ এই সময় মাজারে আসেন।
কুষ্টিয়া জেলায় আগত পীর-আউলিয়া দরবেশ ও তাদের মাজার
হযরত বাবা নফর শাহ্ (র.) বুগদাদী
ইতিহাসবীদদের মতে ১৭৫০-১৮০০ সালের দিকে হযরত নফর শাহ্ (র.) ইসলাম প্রচার করতে কুষ্টিয়া আসেন। তিনি ইরাকের বাগদাদ শহর থেকে এসেছেন বলে তাকে বুগদাদী বলা হয়।
তিনি ঘোড়ার পিঠে চেপে কুষ্টিয়া জেলায় ইসলাম প্রচার করতে আসেন। কুষ্টিয়া শহরের পূর্বদিকে যে যায়গাতে তিনি অবস্থান করতেন সেটা বসবাসের অযোগ্য অন্ধকার ও জঙ্গল ঘেরা ছিল। সেখানে তিনি কুপি জ্বালিয়ে আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীতে সবসময় মশগুল থাকতেন। জঙ্গলের হিংস্র পশুরা তার কোন ক্ষতি সাধন করতো না।
তাঁর ইবাদত বন্দেগী দেখে আশেপাশের হিন্দু, মুসলমান সহ বিভিন্ন ধর্মবলম্বীরা তার কাছে আসতেন এবং তার কথা শুনতেন। নিজ আস্তানাতেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানই তাকে সমাহিত করা হয়।
কুষ্টিয়া শহরের রাজারহাটের পূর্বদিকে মিলপাড়াস্থ আব্দুল আজিজ সড়কে তার কবরকে ঘিরে মাজার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মাজারে প্রতিবছর ২ হতে ৪ এপ্রিল ৩ দিন ব্যাপী ওরশ অনুষ্ঠিত হয়।
কুষ্টিয়া জেলায় আগত পীর-আউলিয়া দরবেশ ও তাদের মাজার
মনছুর আলী আল্-চিশতী নিজামী
কুষ্টিয়া শহরের উদিবাড়ীতে আনুমানিক ১৮৭১ সালে মনছুর আলী আল্-চিশতী নিজামী জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৮৫ সালের ৩ জানুয়ারি একই যায়গায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ফকির চিশতীয়া-নিযামীয়া তরীকাপন্থী পীর ছিলেন।
পাবনা, রাজশাহী সহ বিভিন্ন স্থানে তাঁর অনেক মুরিদ আছেন। পশ্চিম বাংলায়ও তাঁর অনেক মুরিদ আছেন। মনছুর আলী ২১ টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন যার মধ্যে ‘ছেবরুল কোরআন’ গ্রন্থখানি বিশেষ বিখ্যাত।
তাঁর কবরকে কেন্দ্র করে উদিবাড়ীতে মাজার গড়ে উঠেছে। প্রতি বছর ১৯ পৌষ থেকে ৩ দিন ব্যপী এখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়।
কুষ্টিয়া জেলায় আগত পীর-আউলিয়া দরবেশ ও তাদের মাজার
হযরত বাবা সোলাইমান শাহ্ চিশতী (র.)
ইসলাম ধর্ম প্রচারের জন্য ঊনবিংশ শতকে যে সকল আউলিয়া, দরবেশ, গাউস, কুতুব, পীর, ফকির এই উপমহাদেশে জন্মগ্রহণ করেছেন হযরত বাবা সোলাইমান শাহ্ চিশতী (র.) তাদের মধ্যে অন্যতম।
আনুমানিক বাংলা ১২৮৭ সাল ইংরেজি ১৮৭৯ বা ১৮৮০ সালে বারিশাল জেলার নলসিটি উপজেলার কাকলী আউলিয়াপুর গ্রামে হযরত বাবা সোলাইমান শাহ্ চিশতী (র.) জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম ছিল মহাম্মদ মাজহার উদ্দিন খান।
পশ্চিমবাংলার ফুরফুরা দাখিল মাদ্রাসা ও কলিকাতা আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে পবিত্র আল কোরআন ও হাদিস সাস্ত্রে সম্যক জ্ঞান অর্জন করেন। আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভের অদম্য বাসনায় ভারত,বাংলাদেশ ও পাকস্থানের বিভিন্ন পীর আওলিয়ার মাজার ও ধর্মীয় বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ ও জিয়ারত করেন।
ভারতের বিখ্যাত দিল্লী জামে মসজিদে কিছুদিন ইমামতি করেন। দিল্লী মসজিদে আগত কাফেলার জনৈক প্রবীণ ফকির তাকে সোলায়মান মাওলানা বলে ডাকা শুরু করলে পরবর্তিতে তিনি এই নামেই পরিচিত হয়ে উঠেন।
আকাঙ্খিত মুর্শিদ বা অছিলা লাভের উদ্দেশ্যে তিনি দিল্লী জামে মসজিদের ইমামতি ছেড়ে আবারও তীর্থ ভ্রমণে বের হন এবং আজমির শরীফে চলে আসেন। হযরত খাজা মঈনউদ্দিন চিশতী (র.) এর দরগাহ্ প্রাঙ্গণে এসে তিনি মুর্শিদ মর্দানী পাঠান আব্দুস শুকুর মঙ্গলবাবার সান্নিধ্য লাভ করেন এবং বায়াত গ্রহণ করেন।
খাজা বাবার দরবার থেকে দুর্লভ সোলাইমানি আঙ্গুরী এবং ফকিরি তাবারুক হিসেবে চটের কোর্ত্তা,পাজামা, টুপি ও জুলদান অর্জন করেন। এরপর শুরু হয় সোলাইমান বাবার নতুন পথ চলা বা নতুন জীবন।
একে একে তিনি আস্তানা গাড়েন হুগলী জেলার ফুলতলা, নদীয়া জেলার ভেড়ামারার ভবানীপুর, বর্ধমান জেলার মাঠের পাড়া, নদীয়ার চর-ই-কুরি, ভবানীপুর, দর্শনা, বাঁকা মাঠপাড়া, ভাগজোত, মওলা হাবাসপুর, ঝিনাইদহের সাহেবনগর, ঢাকার ঝাপটা, জাজিয়ার চর ও টরকির ফলতলাতে। তাঁর আচার ব্যবহার, ধর্মীয় বক্তব্য ও বিভিন্ন অলৌকিতায় মুগ্ধ হয়ে বহু অমুসলিম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
সর্বশেষ তিনি তিনটি তক্তা দিয়ে নির্মিত মাঝি-মাল্লা বিহীন কোষা নৌকা চড়ে পদ্মা নদী পাড়ি দিয়ে বাহাদুরপুর গ্রামের গোলাপনগর বাজার সংলগ্ন স্থানে এসে আসন পাতেন এবং ধ্যানে মগ্ন হন। সিদ্দিক আলী খাঁন নামক একজন ডাকাত তার মুরিদ হন এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত খলিফা হিসাবে কাটিয়ে দেন।
সোলাইমান শাহের এক ভক্ত মৌলবি মোঃ আব্দুল মান্নানের উদ্যোগে গোলাপনগর আস্তানার পাশে একাটি মাদ্রাসা ও হাসপাতাল স্থাপিত হয়। মাদ্রাসাটি বর্তমান কাঙ্গালী পাড়ায় বাবার ওয়াকফকৃত জমিতে সরিয়ে আনা হয়েছে।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১২ এপ্রিল সকালে পাকসেনারা তাঁর আস্তানায় গ্রেনেড চার্জ করে এবং এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণ করতে থাকে। সোলাইমান শাহ তখন ভক্তসহ ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। গ্রেনেড ও গুলিতে অনেক মুরিদ শহীদ হন। ঘরটিতে আগুন ধরে গেলে তিনি আগুনের মধ্যেথেকে অক্ষত বের হয়ে রেল লাইন ধরে হাটতে থাকেন। পাক সেনাদের ছোড়া গুলি তাকে বিদ্ধ করতে পারেনা।
একপর্যায়ে গ্রামের অন্য কারও ক্ষতি না করার শর্তে তিনি তার স্বরিলের নির্দিষ্ট স্থানে গুলি করতে বলেন। এরপর পাকসেনারা তার ডান বগলের নিচে গুলি করলে তিনি লুটিয়ে পড়ে শহীদ হন। তিনি সম্ভবত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হওয়া একমাত্র পীর বা আউলিয়া।
গোলাপনগরে অত্যন্ত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও ছায়াঘেরা নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশে এই আধ্যাত্নিক সাধকের মাজার গড়ে উঠেছে। প্রতিদিন বিভিন্ন ধর্মের হাজার হাজার মানুষ এখানে জিয়ারত ও দর্শনের উদ্দেশ্যে হাজির হন। প্রতি বছর ২৭, ২৮ ও ২৯ চৈত্র এখানে পবিত্র ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়।
কুষ্টিয়া জেলায় আগত পীর-আউলিয়া দরবেশ ও তাদের মাজার
হযরত শাহ্ সুফি মীর মাসুদ হেলাল (র.)
হযরত শাহ্ সুফি মীর মাসুদ হেলাল (র.) ১৯৪৩ সালের ১২ ডিসেম্বর নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর মহকুমার কাঠুরিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মোহাম্মদী তরিকার প্রতিষ্ঠাতা ও বিশিষ্ট কামেল পরিবারের সন্তান। তাঁর পূর্বপুরুষ হযরত মীর নিয়ামত আলী (র.) ওরফে জমাদার শাহ্ একজন উচ্চ পর্যায়ের কামেল ব্যক্তি ছিলেন। ভারতের নদীয়া জেলার শিবনিবাসে তাঁর মাজার শরিফ রয়েছে।
ছোটবেলা থেকেই হযরত শাহ্ সুফি মীর মাসুদ হেলাল (র.) ধর্মভীরু এবং ইসলামী আমল-আকিদায় পারদর্শী ছিলেন। পিতার তত্ত্বাবধানে ইসলামী মতাদর্শ ও শরীয়তের বিধানাবলী সম্পর্কে তিনি পরিপক্ত হয়ে ওঠেন। ময়মনসিংহের মধুপুর জঙ্গলে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনা করেন। এরপর কুষ্টিয়া জেলার রানাখড়িয়া গ্রামের পীর শাহ্ সুফি শেখ খলিলউদ্দিন (র.) এর নিকট বায়য়াত গ্রহণ করেন।
মাত্র ২৭ বছর বয়সে তিনি কাদেরিয়া তরিকায় খেলাফত প্রাপ্ত হন। পরবর্তিতে একে একে চিশতিয়া, নক্শবন্দ-মোজাদ্দেদী তরীকায় খেলাফত প্রাপ্ত হন। ১৬ শাবান ১৩৩৯৫ হিজরি মোতাবেক ২৫ আগষ্ট ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ, ৮ ভাদ্র ১৮২ বঙ্গাব্দে তিনি কুষ্টিয়া বারোশরীফ দরবারের খলিফা নির্বাচিত হন। এর মাধ্যমে তিনি বারোশরীফের মহান ঈমামরুপে স্বীকৃতি পান এবং বায়াত করার হুকুমপ্রাপ্ত হন।
৬ রমজান ১৪০৫ হিজরি মোতাবেক ১৬ মে ১৯৮৬ সালের কুক্রবার হযরত শাহ্ সুফি মীর মাসুদ হেলাল (র.) এর ওফাত হয়। কুষ্টিয়া শহরের কোটপাড়া বারোশরীফ দরবারে তাকে সমাহিত করা হয়েছে।
৫০ শতক জমির উপর প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিকীর প্রচেষ্টায় নান্দনিক নির্মাণশৈলীতে রওজা মোবারক, দরবার শরীফ ও জামে মসজিদ নির্মিত হয়েছে। বারোশরীফ দরবারে বছরে তিনটি অনুষ্ঠান বিশেষ গুরুত্বের সাথে উদযাপিত হয়। ১২ রবিউল আউয়াল ঈদে মিলাদুন্নবী, ৬ রমজান হযরত শাহ্ সুফি মীর মাসুদ হেলাল (র.) এর ওফাত দিবস উপলক্ষে ওরশ মোবারক এবং ১৬ শাবান বারোশরীফ দরবারের অভিষেক দবস বা প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী।
কুষ্টিয়া জেলায় আগত পীর-আউলিয়া দরবেশ ও তাদের মাজার
মৌলায়ে শেরে মস্তান কালেন্দরী (র.)
মৌলায়ে শেরে মস্তান কালেন্দরী (র.) এর আসল নাম হযরত শাহ্ সুফি সৈয়দ হামজাদ নূরুল হুদা। জন্ম পাকিস্তানের মাসকান্দারে। পিতার নাম ছিল সৈয়দ আব্দুল্লাহ। তিনি বাংলাদেশে কবে আসেন সে বিষয়ে কেউ জানেন না। তবে ময়মনসিংহ, সিলেট ও নোয়াখালী জেলায় অনেকদিন ছিলেন এবং সেসকল স্থানে তাঁর কাছে বহু লোক মুরিদ হয়েছিলেন বলে জানা জায়।
তিনি কুষ্টিয়া শহরের পূর্বপ্রান্ত মিলপাড়াতে গড়াই নদীর তীরে আস্তানা স্থাপন করেন এবং প্রায় দশ বছর ছিলেন। সেখানে তিনি ‘বিশ্ব মানব ধর্ম কেন্দ্র’ গড়ে তোলেন। তিনি চিশতীয়া, কাদেরীয়া, নক্শবন্দিয়া ও মোজাদ্দাদীয়া এই চার তরীকাতেই সাধনা করে কামিলিয়াত লাভ করেছিলেন বলে তার ভক্তরা জানান।
১৯৭২ সালের ২৯ আগষ্ট কুষ্টিয়া শহরের কালিশংকরপুরে তার এক ভক্তের বাড়ীতে ইন্তেকাল করেন। তার আস্তানাতেই তাকে দাফন করা হয়। এখানে তার মাজার শরিফ গড়ে উঠেছে। প্রতি বছর ২৮, ২৯ ও ৩০ আষাঢ় এখানে ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। দেশ বিদেশ থেকে বহু ভক্ত শুভাকাঙ্খি এসে এসময় মাজারে ভিড় করেন। এছাড়াও প্রতি বছর ২৯ আগষ্ট তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে মাজারে শিরনি দেওয়ার চল প্রচলিত আছে।
আরও পড়ুনঃ কুষ্টিয়া জেলার ইতিহাস

