শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে ৩ দিনের রবিন্দ্রজয়ন্তি

শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে শুরু হলো রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তীর তিনদিনব্যাপী আয়োজন

আয়োজন ঘিরে নানা বিতর্ক ও সমালোচনা

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী জাতীয়ভাবে পালনের অংশ হিসেবে কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয় শুক্রবার বিকেলে শিলাইদহ কুঠিবাড়ির স্থায়ী মঞ্চে।

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর অবদান অনন্য ও চিরস্মরণীয়। কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক ও প্রবন্ধসহ সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই তিনি অসামান্য সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর রচিত রবীন্দ্রসংগীত আজও বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি বিষয়ক মাননীয় উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। এছাড়াও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

বিকেল সাড়ে ৩টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। পরে অতিথিরা কবিগুরুর জীবন, সাহিত্যকর্ম ও বাঙালি সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান নিয়ে আলোচনা করেন। বক্তারা বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু বাংলা সাহিত্য নয়, বিশ্বসাহিত্যেও এক অনন্য নাম। তাঁর সাহিত্য, গান ও দর্শন আজও মানুষের জীবন ও সমাজকে প্রভাবিত করছে।

সন্ধ্যার পর স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীরা রবীন্দ্রসংগীত, কবিতা আবৃত্তি ও নৃত্য পরিবেশন করেন। কুঠিবাড়ি প্রাঙ্গণে আগত দর্শনার্থীরা সাংস্কৃতিক আয়োজন উপভোগ করেন। তবে অনুষ্ঠান ঘিরে শুরু থেকেই কিছু বিতর্ক ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়।

১ম দিনের অনুষ্ঠান সূচী
রবিন্দ্রজয়ন্তি ১ম দিনের অনুষ্ঠান সূচী

অভিযোগ ওঠে, কুমারখালী-খোকসা আসনের সংসদ সদস্যসহ কুষ্টিয়ার তিনটি আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের প্রথমে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। পরে আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং অনুষ্ঠানের ব্যানারেও নাম সংযোজন করা হয় বলে জানা যায়।

এদিকে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর কুমারখালী-খোকসা আসনের সংসদ সদস্য জনাব আফজাল হোসেনের মঞ্চে আগমনকে কেন্দ্র করেও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। উপস্থিত বিভিন্ন মহলে বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অনেক দর্শনার্থী অভিযোগ করেন, সারাদিন উল্লেখযোগ্য কোনো সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ছিল না। প্রতিবছর রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি এলাকায় বড় পরিসরে মেলার আয়োজন করা হলেও এবার শুরুতে মেলার অনুমোদন ছিল না। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগের রাতে অনুমোদন দেওয়া হলেও সময়ের স্বল্পতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে পূর্ণাঙ্গ মেলা আয়োজন সম্ভব হয়নি।

তবে কুঠিবাড়ির প্রবেশপথের দুই পাশে কিছু অস্থায়ী খাবার ও খেলনার দোকান বসতে দেখা যায়। দর্শনার্থীদের অনেকে জানান, পূর্বের বছরগুলোর তুলনায় এবারের আয়োজন ছিল অনেকটাই সীমিত ও অপরিকল্পিত।

অনুষ্ঠানের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেক সংবাদকর্মী ও দর্শনার্থী। জানা যায়, সন্ধ্যার পর আয়োজনে বিশৃঙ্খলা ও পর্যাপ্ত সমন্বয়ের অভাবের কারণে কয়েকজন সংবাদকর্মী অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন।

সাংস্কৃতিক সংগঠনের নাম ও সূচী
সাংস্কৃতিক সংগঠনের নাম ও সূচী

সব মিলিয়ে, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মবার্ষিকী উদযাপনের এই আয়োজন সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বহন করলেও ব্যবস্থাপনা, আমন্ত্রণ বিতর্ক ও সীমিত আয়োজনের কারণে তা সমালোচনার মুখে পড়েছে। তবুও শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে রবীন্দ্রচর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রতিবছরের মতো এবারও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

এছাড়াও কুষ্টিয়া শহরে অবস্থিত টেগর লজ-এও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে পৃথক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত এই ঐতিহাসিক স্থানে দিনব্যাপী আলোচনা সভা, কবিতা আবৃত্তি ও রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে কবিগুরুকে স্মরণ করা হয়।

অনুষ্ঠানে স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাহিত্যপ্রেমী, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। বক্তারা বলেন, কুষ্টিয়ার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি ও সাহিত্যচর্চার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। শিলাইদহ কুঠিবাড়ির পাশাপাশি টেগর লজও রবীন্দ্র গবেষণা ও সাংস্কৃতিক চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে পরিচিত।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে শিল্পীরা কবিগুরুর লেখা বিভিন্ন গান পরিবেশন করেন এবং আবৃত্তিশিল্পীরা তাঁর কবিতা পাঠ করেন। আয়োজন ঘিরে উপস্থিত দর্শনার্থীদের মধ্যে উৎসবমুখর পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই মনে করেন, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য ও দর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এদিকে একই দিনে শিলাইদহ কুঠিবাড়ি ও টেগর লজ—দুই স্থানেই রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠান হওয়ায় কুষ্টিয়াজুড়ে এক ধরনের সাংস্কৃতিক আবহ তৈরি হয়েছে।

আগামীকাল ২৬ বৈশাখ ও পরশু ২৭ বৈশাখও দিনব্যপী বিভিন্ন কর্মসূচী রয়েছে। আপনি আসছেন তো?

Scroll to Top